জল ও জঙ্গলের কাব্যে একদিন,পূবাইল-গাজীপুর

পিকনিক! পিকনিক!! পিকনিক!!! হঠাৎ করেই মুনির স্যার ঘোষণা দিলেন সামনেই পিকনিক। কয়েকদিন পর জানা গেল সেটি হচ্ছে পূবাইল এর “জল ও জঙ্গলের কাব্য” নামক কোন এক স্থানে। একটা পিকনিকের জন্য অনেকদিনের অপেক্ষা। কিন্তু পিকনিকের তারিখ শুনার পর মনটা খারাপ হয়ে গেল। কারণ যেদিন পিকনিক সেদিন আমার মত, আমাদের অনেকেরই ক্লাস আছে। এত মজার পিকনিক মিস করব। পিকনিক ছিল মার্চ  মাসের এক তারিখ, বুধবার। পিকনিকের আগের দিন পর্যন্ত নিশ্চিত ছিলাম না যাব কিনা। পরে চিন্তা করলাম দূর একদিন না হয় ক্লাস মিস যাবে। :p ওমা! পরে দেখি বুধবার পরিবহন শ্রমিকদের অবরোধ। মানে অঘোষিত ক্লাস বন্ধ। এবার পিকনিক হবেই। 😀 পিকনিকের আগের রাতটা ছিল বড়ই অস্থির সময়। সবকিছু কেমন যেন ছটফটে। সবাই মিলে নেটে সার্চ করতেছি, জায়গাটায় কি কি আছে, কালকে সারাদিন কি কি করব এসব প্ল্যান।

 

আমার বাসা টংগীতে। তাই চাইলেই সরাসরি টংগী থেকে পূবাইল চলে যেতে পারি। কিন্তু একটা পিকনিকের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল পিকনিক বাস। ওটার মজা মিস করতে চাই নি। তাই ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেই অনেক কষ্টে (যেহেতু অবরোধ ছিল) শাহবাগ চলে গেলোম। সবাই আমাকে দেখে অবশ্য অবাকই হয়েছিল। অবরোধের কারণে অবশ্য বাস পাওয়া যায়নি। তাই আলাদা গাড়ি ভাড়া করতে হয়েছিল এবং তাতে করেই অামাদের যাত্রা শুরু।

শাহবাগ থেকে পূবাইল। যাত্রা পথে অনেক মজা করলাম। রাস্তা ফাঁকা থাকায় যেতে খুব সমস্যা হয় নাই। ভাদুন এলাকার ভিতর দিয়ে যখন ডুকছিলাম হঠাৎ মনটা গেয়ে উঠল “গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ”। ভাদুনে আমি আগেও কয়েকবার গিয়েছি। গ্রামটা অনেক সুন্দর। পূবাইল এরিয়াতে যত শুটিং হয় তার প্রায় বেশিরভাগই হয় এ গ্রামে। “জল ও জঙ্গলের কাব্য” স্থানটা মোটামুটি একটু ভিতরে। যেতে যেতে আমরা রাস্তার দুপাশের গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। যে কখনো গ্রাম দেখেনি তাঁর কাছে এটা স্বর্গের একটা ছায়া বলে মনে হবে। অবশেষে যখন আমরা পিকনিক স্পটে পৌঁছালাম, কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর দেখলাম একজন শরবতের অনেকগুলো জগ-গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সে শরবত খেয়ে সবাই ভিতরের পথে পা বাড়ালাম।

ভিতরের দিকে যাত্রা
আসেন শরবত খাই

 

 

 

 

 

 

 

ভিতরের দিকে যেতেই ডান দিকে একটা জঙ্গলের দেখা পেলাম। জঙ্গলের ভিতরটা একদম নিরিবিলি। রাতের বেলা যদি থাকতে পারতাম তাহলে ভূত ভূত খেলা যেত এখানে। 😉

জঙ্গল
বসন্তের পতাঝরা গাছ

 

 

 

 

 

 

 

 

ভিতরের দিকে যেতেই দেখলাম একদল বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান শুনাচ্ছেন। অনেকেই সেখানে গান শুনছেন। অতি উৎসাহী অনেকে আবার সে বাদ্যযন্ত্রগুলো বাজিয়েও দেখছেন। পাশেই একদল তখন সকালের রান্নার কাজে ব্যস্ত।

চলছে গানের আড্ডা
সকালের রান্না-বান্না

 

 

 

 

 

 

 

 

বাম দিকেই রয়েছে বিশাল বড় একটা পুকুর। এ সময়ে পানি অবশ্য কম। পুকুরের আশেপাশে বাঁশঝাড় এবং বিভিন্ন সবজির মাচা রয়েছে। পানিতে আমরা কেউ নামতে পারি নি অবশ্য। কিন্তু পানি ছিটাছিটি আর পানিতে পাঁ ভিজিয়ে রাখার মজা অনেকেই নিয়েছে।

পুকুর পাড়ে
পুকুর

 

 

 

 

 

 

 

পাশেই ছোট একটি পুকুরের উপর বিশ্রাম করার জায়গা আছে। বর্ষাকালে এখানে বসে বসে সুন্দর মত পানির দৃশ্য উপভোগ করা যাবে। আপনি যদি সারাদিন এখানে থাকেন, দুপুরের হালকা ক্লান্তিতে শীতল পাটির উপর একটু বিশ্রাম করে নিতে পারবেন চমৎকারভাবে।

 

 

 

 

 

 

 

পাশেই একটা বট গাছ ছিল। হঠাৎ মাথায় আসল গাছে উঠব। যেই ভাবা সেই কাজ, গাছের উপর উঠে পড়লাম। আমার দেখাদেখি অন্যরাও উঠল। যারা কোনদিন আগে গাছে উঠে নাই, ওদেরকেও গাছে উঠিয়ে ছেড়েছি। 😀 কখনও যদি এখানে আসেন, এ কাজটা করতে ভুলবেন না।

 

 

 

 

 

 

এবার জায়গাটা সম্পর্কে একটু বলি, গ্রাম দেখে যারা অভ্যস্ত, তাদের হয়ত অনেকের এ জায়গা ভালো লাগবে না। উত্তর হতে পারে এমন যে, আরে আমার গ্রামের বাড়িই ত এর থেকে অনেক সুন্দর। কিন্তু আপনি যদি আবার অনেকদিন গ্রাম থেকে দূরে থাকেন, তাহলে কিন্তু স্মৃতিকাতর হয়ে পড়বেন। গ্রাম যারা দেখেননি  কখনো তারা যদি এ জায়গায় যান কিংবা শহুরে কর্মক্লান্তি থেকে একটু অবসর চান তাহলে এ জায়গাটা অনেক চমৎকার হবে আপনার জন্য। নিচে কিছু ছবি দিচ্ছি। পুরো জায়গায় অনেকগুলো ছোট ছোট টং এর মত ঘর আছে। সেখানে বসে প্রাকৃতিক হাওয়া খেতে খেতে আড্ডা দিতে পারবেন। আছে বাচ্চাদের জন্য খেলার বেশ কিছু দোলনা,স্লিপার। শহুরে পরিবেশে বেড়ে উঠা আপনার ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন ওই জায়গা থেকে।

বিকেল বেলা নদী পাড়ে বসে হাতে এক কাপ চা নিয়ে জম্পেশ আড্ডা দেওয়ার জন্য জায়গাটা চমৎকার

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এখানে অনেক বড় একটা খেলার মাঠ আছে। এই এক মাঠেই দুই পাশে আলাদা দুইটি ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করতে পারবেন। আমরা ক্রিকেট,ফুটবল,ভলিবল খেললাম এখানে। ক্রিকেট ম্যাচে এক ওভার বল করার চাঞ্চ পেয়েছিলাম। তিন রান দিয়ে দুই উইকেট নিয়েছি। 😉

 

 

 

 

 

 

মাঠের চারপাশটায় প্রচুর ফসলের জমি রয়েছে। ধান গাছে কাঠ হয় কিনা এই প্রশ্নের উত্তর আপনি এখান থেকে পেতে পারবেন। পাশে ছোট্ট একটা খাল রয়েছে। এই সময়টায় পানি অবশ্য একটু কম। ওপাশের আরেকটা ছোট্ট পুকুরে ফুটন্ত শাপলা দেখলাম। সব মিলিয়ে চমৎকার আবহাওয়া।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ঘুরাঘুরি, খেলাধুলা করতে করতে একসময় সবার ক্ষিদে পেল। রান্না-বান্নার প্রস্তুতি শেষে সবাই খেতে বসলাম। খাবারটা সত্যিই দারুণ হয়েছে। খাওয়ার পর পাশের একটা উঁচু টং এ সবাই মিলে আড্ডা দিলাম।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

যে ছোট্ট খালটার কথা বললাম ওটার পাশেই লাউ কুমড়ার অনেকগুলো গাছ আছে। পুরো এরিয়াতে অনেকগুলো আম গাছ আছে। ভাবতেছিলাম, ইস! যদি আর কয়েকদিন পর আসতাম তাহলে গাছের আমগুলো খাওয়া যেত। কারণ তখনও গাছে মুকুল।

 

 

 

 

 

 

অন্য সব পিকনিকের মত এখানেও ছিল র‌্যাফেল ড্র এর ব্যবস্থা। ছিল বেশ কিছু মজার গেইম শোও। লাইফে প্রথম মনে হয় কোন কিছু পেলাম। কি পেলাম সেটা নিচের ছবিতে।

 

 

 

 

 

 

দিন শেষে যখন সূর্য যখন ডুবে যাচ্ছে। তখন একজন বিশাল এক গামলাতে করে ভাপা পিঠা নিয়ে আসলেন। সবাই মজা করে খেল সে পিঠা। সবশেষে বিদায় নেবার পালা।

 

এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করাটা সত্যিই চমৎকার
আমরা ( সবাই যখন এক সাথে মাচার উপর উঠল এটা ঢুলতেছিল, অনেকে ভয় পাইছে :p )

 

 

যারা এই স্থানে যেতে চান:

আপনাকে যে কোন জায়গা থেকে বাসে প্রথমে টংগী স্টেশন রোড আসতে হবে। তারপর সেখান থেকে ট্যাম্পুতে করে পূবাইল রেল-গেইট যেতে হবে। সেখানে থেকে অটোতে করে “জল ও জঙ্গলের কাব্য”তে। আর যদি ট্রেনে আসেন তাহলে টংগী স্টেশনে নেমে পাশের ফ্লাইওভারের নিচ থেকে ট্যাম্পুতে করে পূবাইল রেল-গেইট যেতে হবে। সেখানে থেকে অটোতে করে “জল ও জঙ্গলের কাব্য”তে।

 

খরচঃ

জনপ্রতি ৩০০০ টাকা (সকাল+দুপুর+রাতের খাবার সহ), খাবার দুই বেলার হলে ১৫০০ টাকা।

শিশু (৫-১০ বছর), কাজের লোক ও ড্রাইভার – ৬০০ টাকা জনপ্রতি।

 
যোগাযোগঃ 

মিঃ কামরুলঃ ০১৯১৯-৭৮২২৪৫
মিঃ সাহেব আলিঃ ০১৭১৯-৫২৩০১৬