বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, মানিকগঞ্জ

৩০ ডিসেম্বর ২০১৬। সকাল বেলা একটা কাজের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে আমি, পারভেজ ভাই, শিবলি ভাই, অনিক ভাই এবং কামরুল ভাই গিয়েছিলাম ঢাকার পাশেই ধামরাই এলকায়। সেখানে তানভীর ভাই আমাদের বললেন খুব কাছেই রয়েছে মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। সময় থাকলে গিয়ে দেখে আসতে পার। আমিও চাচ্ছিলাম আশেপাশে দেখার মত যদি কিছু থাকে ত দেখে আসা যায়। প্রস্তাব দেওয়ার পর সবাই রাজি হল। তবে কাজ থাকায় তানভীর ভাই আমাদের সাথে যেতে পারেন নি। আমদের সাথে পারভেজ ভাইয়ের গাড়ি ছিল। দুপুরে রওনা দিলাম জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে।

পথে যেতে যেতে চোখে পড়ল বিশাল হলুদের সমারহ

বালিয়াটি প্রাসাদে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে টিকেট কিনতে হবে। টিকেটের মূল্য দেশী দর্শকদের জন্য ২০ টাকা। সার্কভূক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ১০০ টাকা এবং বিদেশীদের জন্য ২০০ টাকা। ত টিকেট কিনে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশমুখেই চোখে পড়ল চারটি খিলান দরজা। যারা প্রতিটির উপর একটি করে সিংহ।

সিংহদ্বার
টিকেট কাউন্টার

 

বাংলাদেশে খ্রিস্টীয় উনিশ শতকের একটি অপূর্ব নিদর্শন এই বালিয়াটি প্রাসাদ। বালিয়াটির জমিদার গোবিন্দ রাম সাহা ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন খ্রিস্টীয় আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময় পর্বের একজন বড় মাপের লবণ ব্যবসায়ী। দধী রাম, পন্ডিত রাম, আননন্দ রাম এবং গোলাপ রাম নামে চার পুত্র রেখে তিনি প্রয়াত হয়েছিলেন। সম্ভবত বালিয়াটি প্রাসাদটি তাদের দ্বারাই নির্মিত হয়। ৫.৮৮ একর জমির উপর বিস্তৃত এই নিদর্শনটি বিভিন্ন পরিমাপ ও আকৃতির দু’শতাধিক কোঠা ধারণ করেছে। উত্তর দিকে রয়েছে ছয়ঘাট বিশিষ্ট একটি পুকুর। এছাড়া ভেতরে রয়েছে সাতটি খন্ডে বিভক্ত বিভিন্ন স্থাপনা, স্নানাগার, প্রক্ষালন কক্ষ প্রভৃতি।  পুরো অংশটির চারদিকে সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। দক্ষিণ প্রাচীরে পাশাপাশি একই ধরনের চারটি খিলান দরজা রয়েছে। প্রতিটির উপর রয়েছে একটি করে সিংহ। স্থাপনাসমূহের আকর্ষণীয় দিক হল সারিবদ্ধ বিশাল আকৃতির করিনথিয়ান থাম, লোহার বীম, ঢালাই লোহার পেচাঁনো সিঁড়ি, জানালায় রঙ্গিন কাঁচ, কক্ষের অভ্যন্তরে বিশাল আকৃতির বেলজিয়াম আয়না, কারুকার্যখচিত দেয়াল ও মেঝে ঝাড়বাতি ইত্যাদি।

বালিয়াটি প্রাসাদটি বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক ১৯৬৮ সনের এন্টিকুইটি এ্যাক্টের ১৪ নং ধারা (১৯৭৬ সনে সংশোধিত) এর আওতায় সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত হচ্ছে। পশ্চিম দিক থেকে দ্বিতীয় স্থাপনাটির দ্বিতলের একটি অংশে জাদুঘর এ সংগৃহীত বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে।

 

 

ভিতরে প্রবেশ করার পর যে চারটি মূল দরজা বা গেইট এর কথা বললাম। এখানে অনেকগুলো ঘর দেখতে পেলাম। সবগুলো ঘরই খালি। পশ্চিম পাশে নাট্য মঞ্চ (বালিয়াটি পাবলিক ক্লাব এন্ড লাইব্রেরি) নামে একটি ঘর দেখতে পেলাম। সামনে অনেকগুলো ফুলের গাছ।

নাট্য মঞ্চ

রাজা, জমিদারদের বাড়িতে নাকি জুতা পায়ে প্রবেশ করা যায় না। অথচ আমরা জুতা পায়েই প্রবেশ করলাম এ বাড়িতে। সময় কত আশ্চার্য জিনিস ভাবছি। কালের পরিক্রমায় কতকিছু হয়! একদম শুরতেই রয়েছে চারটি বিশাল ভবন। মনে হয় চার পুত্রের জন্য চারটি দালান। প্রতিটি দালানের কারুকার্য অনেক চমৎকার। সেই সময়ে ইটের তৈরী এত বড় দালান কিভাবে তৈরী হত ভাবছি। ছাদ গুলোইবা তাঁরা ঢালাই করত কিভাবে?

প্রধান চারটি ভবন

 

 

 

 

 

১ নং ভবন
২নং ভবন

 

 

 

 

 

 

৩নং ভবন
৪নং ভবন

 

 

 

 

 

 

ইচ্ছে করছিল ভবনগুলোর ভিতরের প্রতিটি রুম ঘুরে ঘুরে দেখি। তারপর ছাদে উঠব। সেখানে থেকে অাশেপাশের এলাকাটা দেখব। কিন্তু সে রকম কোন সুযোগ ওখানে নেই। 🙁 এবার যাত্রা পিছনের অংশে। চার নং ভবনের ঠিক পিছনেই সুন্দর একটি ছোটখাট বাগান চোখে পড়ল।

এদিক দিয়ে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে একটি পুকুরের। জমিদার বাড়ির পুকুর। পুকুরে পানি কম, সে জন্য হয়তবা খুব সুন্দর লাগছিলনা। এটি ছয়ঘাট বিশিষ্ট একটি পুকুর।

পুকুর
উত্তর পাশে এই খুপরিগুলো ঠিক কি বুঝতে পারলাম না।

 

 

 

 

 

 

আমরা, ছবি তুলে দিলেন শিবলি ভাই
পিছনের অংশ
দুই ভবনের মাঝখানের ফাঁকা অংশ। দেয়ালগুলোর প্লাস্টার উঠে গেছে অনেক জায়গায়।

 

 

 

 

 

 

পরিত্যাক্ত অন্দরমহল।

 

 

 

 

 

ফটো টাইম
ভবনের দেয়াগুলো ও জানালাগুলো। একেবারেই ভঙ্গুর
জানালার গ্রিল

 

 

 

 

 

 

 

কুয়া (নিরাপত্তার জন্য রডের জালি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে)
পরিত্যাক্ত শৌচাগার

 

 

 

 

 

 

 

অন্দরমহলের পূর্ব পাশে আরেকটি ভবন দেখতে পেলাম। এই ভবনটা বেশি পছন্দ হল। ভবনের সামনেই ছোট একটি ঘর দেখতে পেলাম।

 

 

 

 

 

সেলফি টাইম

সবদিক ঘুরা শেষে তারপর গেলাম ২নং প্রসাদে অবস্থিত যাদুঘরে। যেখানে জমিদারদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস সংরক্ষিত রয়েছে। নিচ তলাতে দেখতে পেলাম জমিদারদের ব্যবহৃত লোহার সিন্দুক। আমার কেন জানি মনে হল এগুলা কয়দিন আগে তৈরী। খুব বেশি কাজ দেখলামনা এগুলোতে। প্রাচীনও মনে হয় নি।  :p

লোহার সিন্দুক
লোহার সিন্দুকের ভিতরের অংশ।

 

 

 

 

 

যাদুঘরের ভিতরে রক্ষিত জিনিস
উপরে উঠার কাঠের সিঁড়ি

 

 

 

 

 

 

 

ইন্টারনেট ঘেটে এবাড়ি সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য পেলামঃ

এ বাড়ির এক তেজস্বিণী মহিলা জমিদারের নাম উজ্জ্বলা রানী রায় চৌধুরানী। এ জমিদার বাড়ির প্রাণপুরুষ শাম্বিকা চয়নের মেয়ে কিরণ বালাকে বিয়ে করেছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের দানবীর শহীদ রণদাপ্রসাদ সাহা। যিনি আরপি সাহা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বালিয়াটিতে হাসপাতাল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জমিদার এতে অনুমতি দেননি বলে তিনি নিজের গ্রাম মির্জাপুরে তার মায়ের নামে কুমুদিনী হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা আরপি সাহাকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি আর ফিরে আসেননি। এ বাড়ির জমিদারদের দ্বারা বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য কীর্তির মধ্যে রয়েছে ধামরাইয়ের রথ, ঢাকার কেএল জুবিলী হাইস্কুল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বালিয়াটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যালয়, বালিয়াটি রামকৃষ্ণ মিশন, নহবত খানা, শ্রী শ্রী মাধব গৌড়ির মঠ ঢাকা, নিতাই গৌড়ের আখড়া ইত্যাদি। ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিশোরিলাল রায় চৌধুরীর পিতা এবং যার নামানুসারে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়।

 

বাড়ির প্রতিটি দেয়াল ২০ ইঞ্চি পুরু। গাঁথুনিতে সিমেন্টের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে চুন-সুরকি আর শক্তিশালী কাদামাটি। লোহার রডের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে লোহার পাত। ভেতরে রয়েছে লোহার সিঁড়ি। ধারণা করা হয় সামনের চারটি প্রাসাদ ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হতো। অন্দরমহলে গোবিন্দরাম পরিবার বসবাস করতেন।

জমিদার বাড়িতে যাওয়ার একটু আগেই একটা স্কুল চোখে পড়ল। নাম “বালিয়াটি ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়”। স্কুলটার ভবনটাও চমৎকার। সামনে বিশাল বড় মাঠ। গাড়ি থেকে নামার সুযোগ ছিল না। তাই ওটার ভিতরে যেতে পারি নি। এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ১৯১৯ সালে। নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৯২১ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই বিদ্যালয়টিকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। বাবু রায় বাহাদুর হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রী সরবিন্দু সাহা লাহোর রচিত ‘বালিয়াটির ইতিকথা’ নামক বই অনুযায়ী বিদ্যালয়টি তিনি তার পিতা ঈশ্বরচন্দ্র এর নামে প্রতিষ্ঠা করেন।

 

এটা আমার ব্যক্তিগতভাবে দ্বিতীয় কোন জমিদার বাড়িতে যাওয়া। এবারের ভ্রমণটা সত্যি খুবই চমৎকার ছিল।

 

**ঢাকার গাবতলী থেকে মানিকগঞ্জ বা সরাসরি সাটুরিয়া যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৬০-৭০ টাকা। সাটুরিয়া পৌঁছে সেখান থেকে রিকশা বা লোকাল সিএনজিতে করে জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে। জনপ্রতি ভাড়া ১৫/২০ টাকা। যারা আরিচা হয়ে আসবেন তাঁরা আরিচা থেকে মানিকগঞ্জ/সাটুরিয়ার বাস পাবেন।
 
**বালিয়াটি জমিদার বাড়ি রোববার পূর্ণদিবস আর সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে। অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও বন্ধ থাকে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।