থাকবে না আর কোন শোক এই ঈদটা শ্রেষ্ঠ হোক

উত্তরা দশ নং সেক্টর এর একটি হোটেলে কাজ করে ফারুক ও রাশেদ। আধোয়া গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট, ঘুম ঘুম চোখ, চোখের নিচে কালি আর সাথে মহাজনের রক্ত চক্ষু নিয়ে শুরু হয় তাদের প্রতিটি দিন। বয়স খুব বেশি হলে ৯ কি ১০। সকালে থেকে কাজ শুরু আর রাতে শেষ। এভাবেই তাদের প্রতিটাদিন কেটে যায় পেটের দায়ে। কিন্তু একটু ভালো ব্যাবহার আর কিছু অতিরিক্ত টাকা হাতে গুজে দিলে তাদের ঠোটেঁ কোনায় যে হাসি ফুটে ওঠে তা হাজার টাকা দিয়েও কিনতে পারবেন না।

হোটেলের পাশেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। বড় বাবুদের ছেলে মেয়েরা চকচকে ড্রেস পড়ে রঙ্গিন ব্যাগ কাধে ঝুলিয়ে স্কুলে যায়। আর পিচ্চি দুটো কাজের ফাকেঁ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কিছু হয়ত বলতে চায় ! করতে চায় ! বোঝাতে চায়। কিন্তু বিধি বাম, গরিবের স্বপ্ন দেখেতে নেই। স্বপ্ন মানেই পেট আর পেটের আর্তনাদ……

আপনার আমার আশেপাশেই সমাজে এ রকম বহু সুবিধাবঞ্চিত আছে। এদের অনেকেই আছে যারা ঠিকমত খেতে পায় না, পড়তে পায় না, শৈশব এর রঙ্গিন সব স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে এরা আমার আপনার রঙ্গিন স্বপ্ন ও সুন্দর জীবন যাপন এর জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

ঈদ সমাজের কোন নির্দিষ্ট শ্রেনীর মানুষের জন্য না। ঈদ শুধু নিজের পরিবারকে নিয়ে উদযাপন করেলেই উৎসব হয় না। এটা তখনি উৎসবে পরিণত হবে যখন সবাই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন। ঈদের আনন্দ উপভোগ করার অধিকার সবারই আছে। নিজেদের মানবিক মূল্যবোধ থেকে এবং সমাজের প্রয়োজনেই এবারের ঈদে আমরা চেয়েছিলাম সুবিধাবঞ্চিত সে সকল শিশুদের সাথে একটি দিন কাটাতে। তাদের নতুন পোশাকে রাঙ্গিয়ে, একটি দিন পেটের আর্তনাদ কে বিদায় করে নাচ গান আর আনন্দে মাতিয়ে রাখতে। আয়োজন করা হয় আমাদের ইভেন্ট : Children’s Eid Festival ।। শিশুদের ঈদ উৎসব

নিচে ইভেন্টের কার্যক্রম নিয়ে লিখছি:

চাঁদা সংগ্রহঃ পুরো রামজান মাস ব্যাপী আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে চাঁদা সংগ্রহ করি। বিভিন্ন পার্ক,শপিং মল, মার্কেট এর সামনে থেকে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা চাঁদা সংগ্রহ করেন। ব্যক্তিগত ভাবেও অনেকে আমাদের ফেসবুক ইভেন্ট দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ইভেন্ট এর জন্য তৈরী করা হয় লিফলেট ও স্বেচ্ছাসেবকদের কার্ড। সম্পূর্ণ কাজটি সফল ভাবে সম্পন্ন করার জন্য ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় আলাদা আলাদা জোন তৈরী করা হয়। প্রতিটি জোনে নির্দিষ্ট ভলান্টিয়ার টিম কাজ করে। সমাজের বিভন্ন স্তরের মানুষ আমাদের এ কার্যক্রমে সাহায্য করেন।

শিশুদের ইভেন্ট দেখে এগিয়ে এসে সহযোগিতা করেন কয়েকজন তৃতীয় লিঙ্গের শিশু বন্ধু।

 

13442282 544929239047038 4983825931512361081 n

13417676 545257245680904 1203903274506223398 n

13533227 552504781622817 7002065325376623809 n

13557917 552504784956150 2693984852752494149 n

13494867 548582942015001 6541814848849883424 n

চাঁদা সংগ্রহ করার পর চলে শিশুদের তালিকা তৈরী ও তাদের পোশাক এর মাপ নেওয়ার কাজ। তারপর মার্কেট ঘুরে ঘুরে তাদের জন্য পোশাষ ও অন্যান্য জিনিসপত্র কিনা। যতটুকু সম্ভব আমরা চেয়েছি তাদেরকে একটি ভালো পোষাক দিতে। বৃষ্টিতে ভিজেও এ সময় অামাদের কাজ করতে হয়েছে।

13537672 553170851556210 6133654183189406565 n

13557720 553170758222886 178239506660994666 n

13512224 553734084833220 5651965791922649144 n

13533059 553734224833206 5989136310623609389 n

সব কিসু কেনাকাটা ও সংগ্রহ করা হয়ে গেলে তারপর আমরা আমরা সবার ঈদের পোশাক, সেমাই, দুধ, চিনি এসব প্যাকেটিং করি।

13438896 553734314833197 539405906033045281 n

13567088 553734374833191 5093362743525041399 n

 

এবার সবকিসু বিতরণ করার পালা এবং সবার মুখে মুখে হাসি দেখার সময়। মোট চার ধাপে চারটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে হয় বিতরণ কার্যক্রম। স্থানগুলো হলঃ মিরপুর এক(০১) নং ঈদগাহ মাঠ, পশ্চিম কাফরুল, মোল্লাপাড়া ও আগারগাঁও তালতলা। এই কার্যক্রমে একশর বেশি বাচ্চাকে নতুন পোশাক বিতরণ করা হয়।

 

 

13567268 556034617936500 4976746425074911375 n

13592810 1283916094959680 5162827770267456128 n

13600272 1283916124959677 7046872482503513196 n

13532810 556033801269915 6479663978288048538 n

 

নতুন পোষাক বিতরণ করা শেষ। ঈদের দিন সবাই যখন আমাদের দেওয়া নতুন পোষাক পড়ে বের হয় তখন সেটা দেখতে খুব ভালো লাগছিল। ঈদের দিন সকালে ছোট পরিসরে অনুষ্ঠিত হয় মেহেদি উৎসব এবং তারপর হালকা খেলাধূলার আয়োজন করা হয়। পরে সবার মাঝে মেহেদিগুলো এবং খেলায় বিজয়ীদের মাঝে খেলার সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

 

13619937 556032637936698 6663983881141200698 n

13619871 556032644603364 2254140157048652966 n

13592774 556032711270024 6709474520584833603 n

13626478 556032804603348 3732596915065757162 n

 

দুপুর বেলা আমরা প্রায় দেড় শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও মহিলাদের মাঝে খাবার বিতরণ করি এবং ঈদের দিন সবাই একসাথে খাওয়া দাওয়া করি। এটা অনেক মজার একটা মূহুর্ত ছিল।

 

13615448 556032834603345 5630300387164994380 n

13664673 1425731460785985 869949825 n

13567506 556033211269974 4178927678777372028 n

13612322 556032914603337 5235148521033315979 n

 

আমরা চেষ্টা করেছি বছরে অন্তত এই একটি সময় হলেও কিসু মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে। কতটুকু পেরেছি জানি না। আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেছি।আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা দিন রাত প্রচন্ড পরিশ্রম করেছে। রোজা রেখে বিভিন্ন জায়গায় সারাদিন ঘুরে ঘুরে চাঁদা সংগ্রহ করার মত কাজটি মোটেও সহজ না। নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়াতে মন লাগে, শ্রম দিতে হয়, সাহস লাগে এবং লাগে ইচ্ছা। সুবিধা বঞ্চিত পথশিশুদের হাতে নতুন পোশাক ও ঈদ সামগ্রী তুলে দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে  আমাদের তরুণদের স্বেচ্ছাসেবকরা অনেক পরিশ্রম করেছেন। সকল স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য রইলো ভালবাসা ও শুভকামনা।

সবশেষে আমাদের হাতেখড়ির প্রকাশক ও সম্পাদক তাহাজুল ইসলাম ফয়সাল ভাইয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগ্রহীত লেখা দিয়ে আমার লেখাটি শেষ করছি।

একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকেই ঈদ উৎসবের জন্ম। কাজ করতে গিয়ে কখনোই একবারের জন্যও ভাবিনি পারবো কি না? নিজের উপর আত্মবিশ্বাস আছে বরাবর। তাছাড়া যারা হাতেখড়ি করে তারা মনথেকে কাজকে ভালবেসেই করে। তাই কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই শুরু করা।
কাজ করতে গিয়ে অনেক কথা সহ্য করতে হয়েছে। অনেকে ফোনে থ্রেড দিয়েছেন- ধান্দাবাজি কতদিন ধরে চলবে, ঈদটা তাহলে ভালই হবে আপনাদের, কত পকেটে ভরলেন, এসব ছাড়েন-ভাল হয়া যান! কিন্তু কি জানেন একবারের জন্য প্রতিবাদ করিনি। শুধু এই দিনটির জন্য অপেক্ষ করেছি। ইভেন্টে শুরু থেকেই সকল হিসেব সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছি। শেষটাও সবাই জানতে পারবেন।

ধন্যবাদ জানাই রাজশাহী পুটিয়ার মতিন ভাইকে। ওয়ান ফ্যাশন তার প্রতিষ্ঠান। তিনি শিশুদের জন্য ২৬টি পোশাক পাঠিয়েছেন। আমাদের পাশে এস দাঁড়িয়েছেন প্রধান ক্রাফটের কর্ণদার জিসান প্রধান ভাই। শিশুদের জাতীয় সংগঠন খেলাঘরের শিশুবন্ধুরাও সহযোগিতা করেছেন। ধন্যবাদ বাংলাদেশ মহিলা নারী লেখক পরিষদ। IUBAT (ইউনিভার্সিটি) কর্তৃপক্ষকে কৃতজ্ঞতা শিশুদের আয়োজনে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ করে দেয়ার জন্য। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের বন্ধুদরে কাছে কৃতজ্ঞ থাকলাম। সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান ছায়াতরু’র জন্য শুভেচ্ছা রইলো। দেশের বাহির থেকে এক প্রবাসী ভাইও তিনজন শিশুর জন্য সহায়তা পাঠিয়েছন। এছাড়াও নাম না নাজান সবাইকে অনেক অনেক ভালবাসা রইলো।

 

ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে যাক সবার মাঝে। 😀 😀 

 

13524510 1283915868293036 3912326821615466245 n

13592306 1287900374561252 8734869164400460273 n

 

এই ইভেন্টটি আয়োজন করে জাতীয় শিশু কিশোর পত্রিকা হাতেখড়ি।

হাতেখড়ির ফেসবুক পেইজের লিংক: এখানে।

ইভেন্ট এর ফেসবুক পেইজের লিংক: এখানে।